একফালি বিছানা থেকে পাঁচতারা হোটেল – মেয়েদের ক্রিকেট তার প্রাপ্য অর্জন করে নিয়েছে

২০০৯ বিশ্ব টি-২০তে আমি ভারতের অধিনায়ক ছিলাম। তারপর থেকে আজ অবধি যতবার আমরা খেলেছি, আমি প্রতিবার দলের সদস্য ছিলাম। ছেলেদের আর আমাদের টুর্নামেন্ট একই সঙ্গে হত, যার ফলে মেয়েদের খেলায় দর্শক হত।
এর ফলে আমাদের প্রচারটা একটু বাড়ত ঠিকই, কিন্তু সমস্যা একটা থেকেই যেত: পুরুষদের টুর্নামেন্টের আড়ালে আমাদেরটা ঢাকা পড়ে যেত। সেমিফাইনালের আগে অনেকে জানতেই পারত না যে মেয়েরাও একই সঙ্গে খেলছে। তারপর শেষ তিনটে ম্যাচ টিভিতে দেখালে তবে লোকে জানতে পারত।
এবার ব্যাপারটা অন্যরকম। মেয়েদের বিশ্ব টি-২০ এবার আলাদাভাবে হচ্ছে, তাই প্রথম থেকেই সবাই জেনে যাবে। ২০১৭ বিশ্বকাপের পর থেকে মেয়েদের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা যে হারে বেড়েছে, তাতে সবাই খুশিই হবে।
মেয়েদের বিশ্ব টি-২০ আলাদাভাবে আয়োজন করার আইসিসির এই সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। কী করব, আমি অবসর নিয়ে ফেলেছি, তাই এবার টিভিতে দেখে ভারতের জন্য গলা ফাটাব। তবে ভাল লাগছে যে প্রতিটা খেলা দেখানো হবে।
[![Rumana Ahmed of Bangladesh celebrates during the ICC Women's World T20 warm up match between Bangladesh and Ireland on November 4, 2018 at the Guyana National Stadium in Providence, Guyana.]()
Players to watch in ICC Women’s World T20 2018
Media release
7 Nov 18](/media-releases/902214)
আসলে আমি যখন থেকে খেলছি, তখনকার থেকে মেয়েদের ক্রিকেট আমূল বদলে গেছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২০০৫এ যখন প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গেছিলাম, আমাদের বাঙ্কে শুতে হয়েছিল।
দেশের ভেতর খেলতে রিজার্ভেশন ছাড়া কতবার ট্রেনে চড়েছি! আর মাঠের অবস্থা তথৈবচ – এতই খারাপ মাঠ যে একটু অসাবধান হলেই চোট-আঘাত অনিবার্য। জুনিয়র টুর্নামেন্টে তো ডর্মিটরির মাটিতে তোষক পেতে শুতে হত! সমস্ত দলের জন্য একই বাথরুম বরাদ্দ থাকতঃ তাই নিয়ে অনেক মজার গল্প আছে, সেসব আরেকদিন হবে।
তবে সত্যি কথা বলতে তখন ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স ক্রিকেট কাউন্সিল (IWCC) আর উইলেমস ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (WCAI)এর রসদ খুব সীমিত ছিল। সেই অনুপাতে ওঁরা যথাসাধ্য করতেন।
তারপর ২০০৯এ আইসিসি পুরো দায়িত্ব নেয়। আইসিসি-আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপ হয় ২০০৯এ, অস্ট্রেলিয়ায়। তারপর থেকে সবকিছু আদ্যোপান্ত বদলে যায়।
হঠাৎই একদিন দেখি আমাদের জন্য ঝাঁ-চকচকে হোটেল, ছবির মত মাঠ, দৈনিক ভাতা বরাদ্দ হয়েছে। এদিকে দেশে সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছে বিসিসিআই, তাই দেশের ভেতর টুর্নামেন্টেও আমরা ফ্লাইটে যাতায়াত শুরু হল। আমরা এতদিন শোয়ার জায়গা নিয়ে অচেনা যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা করতাম; এখন তর্ক শুরু হল নিজেদের মধ্যে, জানালার ধারের সীট নিয়ে!
[![Windies]()
Women's cricket now a mirror image of the men's game, says Urooj Mumtaz Khan
Media release
7 Nov 18](/media-releases/901654)
আম্পায়ারিং আর মাঠের মানও অনেক উন্নত হল (মানে কনুইয়ে চোটগুলো বন্ধ হল আর কি!), তবে এত কিছু বদলানো সত্ত্বেও আমাদের প্যাশনে ছিটেফোঁটাও আঁচ পড়ল না!
২০১৭ বিশ্বকাপের কথা আর কী বলব? আমার খেলা অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ শুধু নয়, ব্যবস্থাপনা যা ছিল ছেলেদের বিশ্বকাপকে টেক্কা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিজনেস ক্লাসে যাতায়াত, পাঁচতারা হোটেলে থাকা, এ শহর থেকে ও শহর যেতে লাক্সারি বাস, আর ছেলেদের সমান টাকা। মাঠে গিয়ে খেলা ছাড়া কিছু নিয়ে ভাবতে হয়নি!
সবথেকে বড় কথা, টিভিতে খেলাগুলো দেখিয়েছিল। সমস্ত ধরনের মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কভার করতে। নয়ত প্রতিবার যা হয়… অর্ধেক মানুষ জানতেই পারে না কখন মেয়েদের বিশ্বকাপ শুরু হয় আর কখন শেষ হয়।
ফাইনালের কথা আর কী বলব? পিভি সিন্ধু ২০১৬এ অলিম্পিক ফাইনাল খেলে। সেদিন যত ভারতীয় খেলা দেখেছিল, তার থেকে বেশি দেখেছিল আমাদের ফাইনাল। ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেট কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা এর থেকেই বোঝা যায়। ভাবুন, একটা সময় ছিল যখন এই অঞ্চলের একটা দেশ পয়সার অভাবে একটা টুর্নামেন্টে খেলতে আসতে পারেনি!
আজকাল দলগুলো এত পরিকল্পনা করে যে কয়েক বছর আগে থেকে প্রতিটা টুরের প্ল্যান ছকা হয়ে যায়। বড় বড় টুর্নামেন্টে খেলার মান অনেক বেড়েছে, যার ফলে দেখতেও ভাল লাগে। বিশেষ করে গত বছরে খেলার গুণগত মান অনেক বেড়ে গেছে।
[![Lead pic]()
International Cricket Council signs world first partnership with Uber to support first ever standalone ICC Women's World T20
Media release
8 Nov 18](/media-releases/902428)
আমার ধারণা আসন্ন বিশ্ব টি-২০ বেশ আকর্ষণীয় হবে। আজকাল তো দেশে দেশে টি-২০ লীগ হয়; আশাকরি এদেশেও তাড়াতাড়ি শুরু হবে। এবারে আইপিএলের সময় মুম্বইয়ে একটা প্রদর্শনী ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়; শেষ বল অবধি বলা যাচ্ছিল না কারা জিতবে। মানুষ এই ধরণের খেলা দেখার জন্য মুখিয়ে থাকে।
আসন্ন বিশ্বকাপে আমাদের মূলতঃ দুটো কারণে ভাল করা দরকার: প্রথমতঃ, সবাই বলে যে ভারত খুব একটা ভাল টি-২০ খেলে না, তার একটা জবাব না দিলেই নয়; আর দ্বিতীয়তঃ, এখানে ভাল খেললে মেয়েদের আইপিএল হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
আমার ধারণা এই টুর্নামেন্টে পাটা উইকেট থাকবে, তাই আশাকরি স্মৃতি মন্ধানা ভাল করবে। এশিয়ার বাইরে স্মৃতির পার্ফর্মেন্স বেশ ভাল। বিশেষতঃ এই বছর ইসিবি সুপার লীগে ও দুর্ধর্ষ খেলেছিল। সবথেকে বড় কথা স্মৃতি একা হাতে ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারে।
দক্ষিণ অ্যাফ্রিকার লিজেল লী-ও আমার পছন্দের খেলোয়াড়। ওর প্রতিআক্রমণ দেখতে বেশ ভাল লাগে। আর অস্ট্রেলিয়া যখন এই বছরের শুরুতে এখানে এসেছিল, আমার অ্যাশ গার্ডনারকে চোখে পড়েছিল। গার্ডনার বেশ ভাল অল-রাউন্ডারঃ জোরের ওপর অফস্পিন করায়, তিনে ব্যাট করে, হাতে সবরকমের শট আছে।
এই তিনজনেই বেশ মেরে খেলে, কাজেই আমার বেশ প্রিয়। এদের খেলা দেখার জন্য মুখিয়ে থাকব।
(ভারতের মহিলা দলের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং একদিনের ক্রিকেটে সবথেকে সফল সফল বোলার ঝুলন গোস্বামী ৬৮টি টি টোয়েন্টি ম্যাচে ৫৬টি উইকেট নিয়েছেন। ২০১৮ বিশ্বকাপের ঠিক আগেই তিনি টি টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। )
